Raju Das

রাজু দাসের নাটকঃ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের অনশন

যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের অনশন

রচনা : রাজু দাস ( রচনা কাল – ১৫ ই জানুয়ারি ২০২৪ )

বোলপুর রেলস্টেশন। দুজন দুদিক থেকে প্রবেশ করবে ।

———–

সরলা বৌদি : স্টেশনমাস্টার মশাই , কইলকাতা থন টেরেন আইতে আর কত সময় বাকি আছে ?

স্টেশনমাস্টার : ( ঘড়ি দেখে ) এই একটু পরেই আসবে । কলকাতা থেকে আপনার পরিচিত কেউ আসবেন বুঝি ?

সরলা বৌদি : হ , আমাগো উদ্বাস্তু আন্দোলনের নেতা এবং তপশিলী ফেডারেশনের সভাপতি মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল মশাই আসবেন ।

স্টেশনমাস্টার : বলেন কি যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল আসবেন! এই বোলপুর ! যিনি অবিভক্ত বাংলার সমবায় ও ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী ছিলেন ?

সরলা বৌদি : আইজ্ঞা হ

স্টেশনমাস্টার : ওহ: আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে, কতদিন পরে ওনার মতো ডাকসাইটে জননেতাকে এক্কেবারে কাছের থেকে দেখতে পাবো

সরলা বৌদি : ডাকসাইটে ন্যাতার মানে কি মষ্টার মশাই ?

স্টেশনমাস্টার : ডাকসাইটে মানে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নেতা। জানেন বৌদি, তৎকালীন মন্ত্রীসভাতে যোগেনবাবুকে সমীহ করে না চলার মতো এমন কেউ ছিল না । একবার বুঝলেন বৌদি, একটা বিশেষ কাজ সেরে ধর্মতলা থেকে পায়ে হেঁটে শিয়ালদহ স্টেশনে আসছিলাম, ট্রেন ধরতে । তো সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে, মানে মুখ্যমন্ত্রী ডা: বিধানচন্দ্র রায়ের বাড়ির সামনের মাঠে একেবারে লোকে লোকারণ্য । তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তু মানুষ । অস্থায়ী উঁচু মঞ্চে একে একে নেতা – মন্ত্রীরা মাইকের সামনে এসে ভাষন শুরু করছেন আর সঙ্গে সঙ্গে ডা: বিধান রায় তাঁদেরকে চুপ করে মঞ্চে বসে থাকতে বলছেন। একমাত্র শরৎচন্দ্র বসু প্রতিবাদ করে বললেন – এসব কি হচ্ছে ডা: রায় ! আপনি কি আমার ভাষনও শুনবেন না ? 

বিধান রায় বললেন – আপনারা সবাই কে কি বলবেন,তা আমার জানা আছে । এ সভাতে উদ্বাস্তুদের সঠিক মর্মবেদনার কথা ও দাবি দাওয়া বিষয়ে একমাত্র যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল মহাশয়ই বুঝিয়ে বলতে পারবেন । কাজেই যত সময় লাগে আপনিই বলুন মিঃ:মন্ডল ।

সরলা বৌদি :  জানেন মাষ্টারমশাই, ঐ জনসভায় সুপুর , নুরপুর কলোনির ভাই বোনদের লগে আমিও উপস্থিত হইছিলাম  । দেড়ঘন্টা ধইরয়া ভাষন দিছিলেন মহাপ্রান। ও ভালো কথা সেদিনের ঐ সভায় বিদ্রোহী কবিয়াল সুরেন্দ্রনাথ সরকার মশাই বাস্তুহারাদের দু:খ দুর্দশা নিয়া একখান গান গাইছিলেন –

 তোমারে বলব কি, হে মন্ত্রী বিধান রায় – ও প্রধানমন্ত্রী মহাশয় –

 বাস্তুহারার দু:খ সারা তোমার পক্ষে হল দায় ।।

ক্যাম্পে শুয়ে মাঠে ঘাটে ,

আর কতদিন জীবন কাটে ,

দেখে মোদের দু:খ – কষ্ট

শেয়াল কুকুর লজ্জা পায় ।।

এমন সোনার বাংলাদেশে

মানুষ বেড়ায় ভেসে ভেসে ,

হলাম বাস্তুহারা লক্ষ্মীছাড়া ,

কার কলমের এক খোঁচায় ।

স্টেশনমাস্টার : তোমারে বলব কি হে বিধান রায় ।।

চাই না মোরা দালান কোঠা ,

মোরা চাই ভাত আর কাপড় মোটা ,

তাও যদি না মিলবে তবে

মোদের বাঁচার কি উপায় ।।

বলো মন্ত্রী বিধান রায় ?

 অথচ পরের দিন প্রত্যেকটি খবরের কাগজে অন্যদের নাম ছাপা হলেও যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের নাম ছাপেনি । ঐ ঐ যোগেনবাবু ট্রেন থেকে নেমে এদিকেই এগিয়ে আসছেন ।

সরলা বৌদি :  ( শ্লোগান ) মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল জিন্দাবাদ –

নেপথ্যে কন্ঠ : জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ –

যোগেন্দ্রনাথ : না না, আপনারা আমার জয়ধ্বনি করবেন না । জয়ধ্বনি করুন শিক্ষাব্রতি গুরুচাঁদ ঠাকুরের, জয়ধ্বনি করুন জ্ঞানতাপস আমার শিক্ষাগুরু মহামানব, এবং দলিত বহুজনেদের মুক্তির দিশারী ড: ভীমরাও আম্বেদকরের ।

সরলা বৌদি : জয় ভীমরাও আম্বেদকরের জয় । জয় মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের জয় ।

নেপথ্যে কন্ঠ : জয় ভীমরাও আম্বেদকরের জয় । জয় মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের জয় ।

যোগেন্দ্রনাথ : তারপর, কেমন আছেন বৌদি । একযুগ পরে আপনার সঙ্গে দেখা হলো ।

সরলা বৌদি :  পুববাংলা থন বাড়ি ঘর জমি – জমা সব ফালাইয়া ইন্ডিয়ায় আইস্যা দেবগ্ৰাম , কুপার্স ক্যম্পে কিছুদিন শরণার্থী শিবিরে থাকনের পরে এখন নতুন নুরপুর কলোনিতে ঠাঁই পাইছি । কঠোর পরিশ্রম আর দারিদ্র্যের সঙ্গে মা – বেটায় কোন মতে বাইচা আছিলাম। কিন্তু বেশ কয়েক মাস যাবত সরকারি বাবুরা আর পার্টির ন্যাতারা আইস্যা আমাগো উদ্বাস্তু কলোনিটা তুইল্যা দেবার হুমকি দিতাছে। এমনকি গুন্ডা মস্তান পাঠাইয়া কলোনিতে আগুন জ্বালানোর চেষ্টাও করতেছে । আপনি কন মহাপ্রান! আমরা হিন্দু মুসলমানরা তো ভারতের স্বাধীনতা চাইছিলাম ।  দ্যাশভাগতো চাই নাই ।

যোগেন্দ্রনাথ : আমিওতো চাইনি । অথচ কয়েকজন বর্ণ হিন্দু নেতা এবং ব্যবসায়ী টাটা বিড়ালার হীন স্বার্থ রক্ষার জন্য এই ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত করা হলো । হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তুলে দিল । থাক এসব পুরণো কথা । আপনাদের বাড়ির সকলেই এদেশে চলে এসেছে তো  ?

সরলা বৌদি : আমাগো গেরামের সব্বাই চইল্যা আইছে । কেবল আমার স্বামী আর ছোড মাইয়া বাদে –

যোগেন্দ্রনাথ : কেন ! ওরা এলেন না কেন ?

সরলা বৌদি : কি কইরয়া আইবো , ওরা যে রাজাকার গুন্ডাদের বিরুদ্ধে হাতদা, বটিদাও ল ই য়া রুইখ্যা দাড়াইয়াছিল । তাইতো ওরা আমার সোয়ামীরে রামদাও দিয়া কুপাইয়া কুপাইয়া মারলো । আর ছোড মাইয়াডারে জনাদশেক গুন্ডারা খাবলাইয়া খাবলাইয়া ছ্যাবড়া কইরয়া শ্যাষ কইরা দিছে । হাটের থন ফিরয়া এই দৃশ্য দেইখা আমি চিৎকার কইরয়া কইছিলাম – ক্যান ক্যান তোমরা অগো খুন করলা ! ক্যান, ক্যান, আমাগো সক্কলের ঘর বাড়ি পুড়াইয়া ছারখার কইরয়া দিলা ? ক্যান ,আমরা তো কারও কোন ক্ষতি করে নাই , তবে ক্যান ক্যান এমন  হইলো ক্যান ( কাঁদে )

যোগেন্দ্রনাথ :  শান্ত হোন – শান্ত হোন বৌদি। যারা মানুষকে হত্যা করে, যারা নারীকে ধর্ষণ করে, যারা দাঙ্গা হাঙ্গামায় লুটপাট করে তাদের কোন জাত হয়না । তারা না হিন্দু – না মুছলমান । যাকগে আমাকে হঠাৎ আর্জেন্ট তলব করেছেন কেন , তাই বলুন ?

সরলা বৌদি : আইজ বৈকালে আমাগো নুরপুর কলোনির মাঠে এক জনসভার আয়োজন করেছি , উদ্বাস্তু কলোনির বাসিন্দারা যাতে পুনরায় বাস্তুচ্যুত না হয় আপনি তার ব্যবস্থা করবেন । এই আবেদন নিয়া শ’ দুয়েক নর- নারী আপনারে এবং  লোককবি সুরেন্দ্রনাথ সরকারকে গরুরগাড়িতে লইয়া যাইতে আইছে । ঐ তো ওরা স্টিশনের বাইরে আপনাগো লাইগ্যা অপেক্ষা করতাছে ।

যোগেন্দ্রনাথ : আপনি শুধু শুধু ওদেরকে পাঁচ মাইল রাস্তা কষ্ট করে হাঁটিয়ে এনেছেন! আমি তো পায়ে হেঁটেই যেতে পারতাম ।

স্টেশনমাস্টার : আপনি দলিত – বহুজন মানুষের জন্য কত ত্যাগ, কত দুর্নাম, কত কষ্ট করে চলেছেন আর ওরা আপনাকে অভ্যর্থনা করার জন্য এইটুকু কষ্ট করবে না ! মিঃ মন্ডল, সরি – স্যার , আপনি দয়া করে আমার অফিসের রুমে বসে একটু মিষ্টি মুখে দিলে আমি বাধীত হবো । তাছাড়া আপনার পদধূলিতে আমি ধন্য হবো

যোগেন্দ্রনাথ : আমাকে ক্ষমা করবেন, আপনার আতিথ্য আমি গ্ৰহণ করতে পারবোনা

স্টেশনমাস্টার : কেন স্যার ! আমার  কোন অপরাধ হয়েছে কি ?

যোগেন্দ্রনাথ : আপনি কি পারবেন ঐ স্টেশনের বাইরে অপেক্ষমাণ ভাই বোনদের মিষ্টিমুখ করাতে ? পারবেন ওদেরকে আপনার অফিস রুমে বসাতে ?

স্টেশনমাস্টার : না পারবো না । তবে ওদের সকলকে চিঁড়ে মুড়ি বাতাসা খাইয়ে দেবো, কথা দিচ্ছি

যোগেন্দ্রনাথ : তবে তাই দিন । আমাকে শুধু এক গ্লাস জল পান করান । খুব তেষ্টা পেয়েছে

স্টেশনমাস্টার : জল – জল মানে, জল তো – মা- নে

যোগেন্দ্রনাথ : কি হলো! অমন সংকোচ করছেন কেন ! আরে মশাই, আমি না হয় আপনার গ্লাসটাকে উঁচুতে রেখে জলপান করবো ।

স্টেশনমাস্টার : ছিছি ছিছি , ও কথা বলে লজ্জা দেবেন না স্যার । আসলে আমিও তো এস,সি কমিনিউটির লোক। আসলে আমরা সবাই পুকুর অথবা কুয়োর জল খাই । এদিকে সেই কুয়োটার মধ্যে কয়েকদিন যাবত একটা মৃত কাককে ভাসতে দেখা গেছে ।

সরলা বৌদি : ক্যান, স্টিশনের ঐ মাতায় যে একখান যাতাকল আছিল ?

স্টেশনমাস্টার : সে কলটাও খারাপ হয়ে আছে মাস ছয়েক ।

যোগেন্দ্রনাথ : আশেপাশে ইউনিয়ন বোর্ডের কোন জলের কল নেই ?

স্টেশনমাস্টার : আজ্ঞে না –

যোগেন্দ্রনাথ : সেকি এই বোলপুর রেলস্টেশন থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন । দেশ বিদেশের কত গণ্যমাণ্য ব্যাক্তিদের আসা যাওয়া । সেই স্টেশন চত্বরে একটিও পানিয় জলের ব্যবস্থা নেই । এই কি স্বাধীন ভারতের পরিনতি !

স্টেশনমাস্টার : টিউবওয়েল সারানোর জন্য কতবার যে হেড অপিসে আবেদন করেছি তার ইয়াত্তা নেই ।

যোগেন্দ্রনাথ : শুনুন মাষ্টারমশাই, আপনার টেলিফোনে এক্ষুনি এস, ডি, ও কে এবং আপনার উর্ধ্বতন অফিসারকে বলুন, তপশিলী ফেডারেশনের সভাপতি যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল পানিয় জলের দাবিতে তার শতাধিক সমর্থকদের নিয়ে স্টেশন চত্বরে অনশন ধর্মঘটে বসেছেন । আরো বলবেন – যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল বলেছেন, তিনি এখানকার টিউবওয়েলের জল পান না করে অনশন ভঙ্গ করবেন না । যান – কি হলো! দাড়িয়ে আছেন কেন ? ও আপনি হয়তো ভাবছেন, আজ আমার মন্ত্রীত্বের পাওয়ার নেই বলে সামান্য একটা টিউবওয়েলকে বসাতে পারবেন না ?

স্টেশনমাস্টার : না স্যার, আমি সে কথা ভাবছি না । আমি ভাবছি স্টেশনের মধ্যে অনশনে বসতে দেওয়া আমার উচিত হবে কি না ?

যোগেন্দ্রনাথ : ( রেগে ) হোয়াট ডু ইউ মিন ? আমি প্রাক্তন আইনমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল , আমি কোথায় অনশনে বসবো কি বসবো না, তার জন্য আপনার মতো একজন সামান্য স্টেশনমাস্টারের অনুমতি নিতে হবে ?

স্টেশনমাস্টার : আমাকে ভুল বুঝবেন না স্যার । আমি জানি, আপনার কাছে আমি একজন সামান্য সরকারি কর্মচারী । বুঝতেই পারছেন এই চাকরিটা চলে গেলে আমার পাঁচজনের পরিবারটি না খেয়ে মরবে স্যার !ফ

যোগেন্দ্রনাথ : হা: হা: হা: ভয় নেই। আপনাদের ট্রেন চলাচলের অথবা যাত্রী পরিসেবার কোনরুপ বিঘ্ন ঘটাবো না । আপনি যান , এক্ষুনি ওদের সঙ্গে কথা বলুন –

স্টেশনমাস্টার : স্যার, আপনি একটু বসুন, আমি দেখছি, কি করা যায় ( প্রস্থান )

সরলা বৌদি : মহাপ্রান, আমি বাইরে কলোনির ভাই বইনদের আপনার অনশনের কথাডা বুঝাইয়া দিয়া আসি –

যোগেন্দ্রনাথ : শুনুন বৌদি, ঐ সকল বৃদ্ধ বৃদ্ধা, কচি কাচাদের গরুর গাড়িতে কলোনির মাঠে চলে যেতে বলুন

সরলা বৌদি : আপনি যাইবেন ক্যামনে ?

যোগেন্দ্রনাথ :  কেন ! কেন আপনার মনে নেই ! সকলের সাথে পায়ে হেঁটে গ্ৰামের পর গ্ৰাম আমি জনসংযোগ করিনি ?

সরলা বৌদি : কইরছেন । তয় তহন তো আপনি ডাকসাইটে মন্ত্রী ছিলেন না। ছিলেন বরিশালের দামাল ছেলে যোগেন মন্ডল –

যোগেন্দ্রনাথ : বৌদি, আপনি হয়তো জানেন না, মন্ত্রী হবার পরেও আমার জীবনযাত্রার একটুও পরিবর্তন হয়নি। কারন আমি তো একটা দিনের জন্যেও ভুলতে পারিনি, যে গ্ৰাম বাংলার এক দরিদ্র নমো পরিবারের সন্তান আমি । সেই কিশোর বয়সে নিরাণী -কাস্তে আর লাঙল চালানোর দাগ এখনো আমার হাতের তালুতে উজ্জ্বল হয়ে আছে । এই দেখুন – দেখুন ।

সরলা বৌদি : ( যোগেনের হাতের তালুতে হাত বুলিয়ে ) ঠাকুরপো, আমার সোয়ামী ছিল তোমার ছোডকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু । হের উপর আত্মীয় । আমি তো নিজের চোখে তোমার লড়াইরে দেখছি। ঐ আমলে গেরামের মহিলাদের সঙ্গে লইয়া তোমার লগে লগে কত মিটিং মিছিলে গেছিনা কও ?

যোগেন্দ্রনাথ : সেই সব দিনের কথা ভুলিনি বলেইতো আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে এসেছি,। যেটুকু জানেন না, তা হলো , কোলকাতা এসে ডাক্তার প্যারিমোহন দাসের বাড়িতে থেকে ছাত্র পড়িয়ে, প্রেসে প্রুফ দেখে আমি ওকালতি পড়ে পাশ করেছি । অথচ আমাদের দেশের অধিকাংশ পিছিয়ে রাখা সমাজের ভাই বোনেরা এখনও নিরক্ষর, নিরাশ্রয়, অভুক্ত। ওদের দু:খ না ঘোচানো পর্যন্ত আমার তো বিলাসিতা করা সাজেনা বৌদি –

সরলা বৌদি : তুমি এট্টুস বসো । আমি ওগো লগে কথা কইয়া আসি ( প্রস্থান )

স্টেশনমাস্টার : ( প্রবেশ ) স্যার, ওরা তিনদিনের মধ্যে টিউবওয়েল বসিয়ে দেবেন বলেছেন । আপনি দয়া করে অনশনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করুন স্যার –

যোগেন্দ্রনাথ : আপনি ওদেরকে বলুন, খরা মোকাবেলার জন্য জন্য যে কলগুলো রক্ষিত আছে তার দু তিনটে আজকেই বসানো চাই। এবং তার কোন একটির জলপান না করে আমি অনশন ধর্মঘট ভাঙ্গবো না । এটা আমার প্রতিজ্ঞা । যা ন –

স্টেশনমাস্টার : দেখি কি করা যায়( প্রস্থানোদ্দক )

যোগেন্দ্রনাথ : শুনুন, ওদেরকে আরও বলবেন, আমার কথার খেলাপ হলে আমি মুখ্যমন্ত্রী এবং রেলমন্ত্রীকে টেলিগ্ৰাফ করতে বাধ্য হবো –

স্টেশনমাস্টার : দেখি কি করতে পারি ( প্রস্থান )

সাংবাদিক : ( প্রবেশ ) নমস্কার মিঃ মন্ডল ! আমি একটা দৈনিক খবরের কাগজের সাংবাদিক । শান্তিনিকেতন এসেছিলাম একটি বিশেষ অনুষ্ঠান কভার করতে । স্টেশনের বাইরে জমায়েতে জানতে পারলাম, জলকলের দাবিতে আপনি হঠাৎ অনশনে বসেছেন ?

যোগেন্দ্রনাথ : আপনি সাংবাদিক হিসেবে আরো একাধিকবার  নিশ্চয়ই এই বোলপুর রেলস্টেশনে এসেছেন ! তাইতো ?

সাংবাদিক : হ্যা তা এসেছি ।

যোগেন্দ্রনাথ : তাহলে এখানকার পানীয় জলের সমস্যা সম্বন্ধে নিশ্চয়ই আপনার জানা উচিৎ ছিল। নাকি জেনেও স্থানীয় নেতাদের মতো আপনিও ভেবে রেখেছেন, পচা পুকুরের ও পচা কুয়োর জল পান করে যখন মহামারীর আকার ধারণ করবে, তখন আপনারও টুপাইস কামানোর জন্য খবরের কাগজের হেডলাইন করবেন ?

সাংবাদিক : আসলে স্টেশন এলাকায় কখনো জল পিপাসা পায়নি তো – তাই

যোগেন্দ্রনাথ : কলকাতার ট্রেন এক্ষুনি ঢুকবে। চলে যান –

সাংবাদিক : না,যাব না  । আপনার অবাক জলপান আন্দোলন এবং উদ্বাস্তু কলোনির মিটিং না দেখে আমি ফিরব না । এরমধ্যে আপনি অনুমতি দিলে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবো আপনার কাছে

যোগেন্দ্রনাথ : কি করবেন জেনে ! কাগজে ছাপাবার সময় তো সম্পূর্ণ উল্টোটাই ছাপেন আপনারা –

সাংবাদিক : আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন, আমি সঠিক কথাই ছাপতে পারব । যেহেতু এই খবরের কাগজের প্রধান সম্পাদক ও মালিক আমার ভগ্নিপতি। কাজেই আমার লেখায় কেউ কাঁচি চালাতে পারবেনা ।

যোগেন্দ্রনাথ :  বলুন, কি জানতে চান ?

সাংবাদিক : প্রথম দিকে আপনি গান্ধীজির প্রতি কিছুটা আস্থাবান ছিলেন কিন্তু পরে সরে এলেন কেন। ?

যোগেন্দ্রনাথ : প্রথমত – ১৯৩৯ সালে গান্ধীজির চক্রান্তের ফলে যেভাবে সভাপতির পদ থেকে সুভাষ চন্দ্র বসুকে সরে যেতে হয়েছিল তার আমি মেনে নিতে পারিনি ।   দ্বিতীয়ত – বর্ণহিন্দুদের রাজনৈতিক দল মানেই ব্রাহ্মণ্যবাদী দল ।     তৃতীয়ত  – গান্ধীজি তপশিলী জাতিসমূহকে বিশেষভাবে ‘ হরিজন ‘ হিসেবে চিহ্নিত করে মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন  ।  চতুর্থতঃ  – ১৯৩২ সালে পুনা শহরের যারবেদা জেলে বসে ঐতিহাসিক পুনা প্যাক্টের দ্বারা কৌশলে এস সি  / এস টি -দের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়ে , ঐ একটা লোক  সারাজীবন বহুজন সমাজের ক্ষতিসাধন করেও বর্ণহিন্দুদের খবরের কাগজের প্রচারের দৌলতে হয়ে উঠলেন মহাত্মা। আর ড: আম্বেদকর এবং আমি যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল হয়ে গেলাম দুরাত্মা, সাম্প্রদায়িক !

সাংবাদিক : তবুও আমার মনে হয় গান্ধীজি আপনার প্রতি বেশ সহৃদয়বান ছিলেন

যোগেন্দ্রনাথ : কি করে বুঝলেন ? মিঃ করমচাঁদ গান্ধী কি একান্তে একথা আপনাকে বলেছেন ?

সাংবাদিক : না তা নয় । ১৯৩৭ সালে বিধানসভা নির্বাচনে আপনি অসংরক্ষিত আসনে এবং ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে সমগ্ৰ ভারতের মধ্যে নিখিল ভারত তফসিলী জাতি ফেডারেশন পার্টির পক্ষ থেকে একমাত্র আপনি জয়লাভ করেছিলেন, সেই খবর শুনে গান্ধীজি আপনাকে খবরের কাগজে ভুয়শী প্রশংসা করেছিলেন ।

   বাই দ্যা বাই , ১৯৪০ সালে কোলকাতা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে একাধিক বর্ণহিন্দু প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে আপনি বিজয়ী হয়েছিলেন কি করে ?

যোগেন্দ্রনাথ : দেখুন , বর্ণবিভাজিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে তথাকথিত শূদ্র জাতির সন্তান হিসেবে, অপামর শূদ্র মুক্তির আন্দোলনে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধেই আমার আপোষহীন সংগ্ৰাম । কোন ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য কায়েতদের বিরুদ্ধে নয় । তাই কোলকাতা শহরবাসীর কাছে দেশসেবক হিসেবে আমি কতটা স্বীকৃতি পেয়েছিলাম তা যাচাই করতেই আমি ভোট যুদ্ধে নেমেছিলাম ।

সাংবাদিক : ঠিক বলেছেন  । আপনার সততা, দেশপ্রেমের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ছিল বলেই ভোটারদের কাছে সুভাষ চন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসু আলাদাভাবে আপনার সমর্থনে প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন ।

যোগেন্দ্রনাথ ; হ্যআ, ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে দর্জিপাড়ার জনসভায় শরৎচন্দ্র বসু মহাশয় কি বলেছিলেন তার কি আপনার মনে আছে সাংবাদিক। ?

যোগেন্দ্রনাথ : হ্যা মনে আছে । সেই সভাতে শরৎচন্দ্র বসু বলেছিলেন – বন্ধুগণ, যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল মহাশযের মতো খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং সচ্চরিত্র ব্যক্তি যদি কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে শতকরা দশজনও থাকতেন, তাহলে ভারতবর্ষের রূপ সম্পূর্ণ পাল্টে যেতো ।

যোগেন্দ্রনাথ  : এ হেন শ্রদ্ধেয় শরৎচন্দ্র বসু মহাশয়ের সম্মান রক্ষার্থে নি:স্বার্থভাবে সকল হিন্দু মুসলমান সমাজের সকলের সেবা করেছি আমি ।

সাংবাদিক : সেই সঙ্গে কলকাতা কর্পোরেশনে সংরক্ষিত পাঁচ শতাংশ কোটা আদায় করে পিছিয়ে রাখা সমাজের বেকারদের আপনি চাকরীতে ঢুকিয়েছেন ।

যোগেন্দ্রনাথ : ও ভালো কথা! এই সংরক্ষণের প্রসঙ্গে মনে পড়ছে । ১৯৪৩ সালের এপ্রিল মাসে বাংলায় তখন খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে পুনরায় মন্ত্রীসভা গঠিত হয় –

সাংবাদিক : সেই মন্ত্রীসভাতে আপনি সমবায় ও ঋণদান মন্ত্রী হয়েছিলেন

যোগেন্দ্রনাথ : হ্যা, সে সময়ের একটি ঘটনা আপনাকে বলি কেমন ?

সাংবাদিক : বেশ বলুন – আমিও আমার স্মৃতিশক্তিকে একটু ঝালিয়ে নিতে পারব

যোগেন্দ্রনাথ : ধন্যবাদ । শুনুন , সেই সময় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেবের বাসভবনে সর্বদলীয় একটি বৈঠক হচ্ছিল । বৈঠকে কংগ্রেসের ধনঞ্জয় রায় মহাশয় আমাকে চুপিসারে বললেন – রেশনিং বিভাগে আনুপাতিক হারে তফসিলী জাতির কোটা পূরণ করা হচ্ছে না । এই কথা শুনেই আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল । আমি বললাম – মাননীয়, খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে আমি জানাতে চাই , সংরক্ষণের ব্যাপারে কোনো রকম কম্প্রোমাইজ করতে আমি রাজি নই । মুছলিম লীগ মুছলমান প্রার্থী নিয়োগ করেছে । হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস বর্ণ হিন্দুদের নিয়োগ করেছে, । তপশিলী জাতি ফেডারেশন , তপশিলী জাতির প্রার্থীকে নিয়োগ করবে না কেন ? আপনারা সব্বাই শুনে রাখুন – আমি যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল স্পষ্টভাবে বলছি যদি আমার সমাজের ছেলে মেয়েদের কোটায় চাকরি না হয় তাহলে আমার ডিপার্টমেন্টে একটিও মুছলিম এবং বর্ণহিন্দু প্রার্থীকে ঢুকতে দেবো না ।

সাংবাদিক : আপনার এমন স্পর্ধিত কথা শুনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা হামিদুল হক চৌধুরী অতিশয় ক্রদ্ধ স্বরে বললেন – যোগেনবাবু এমন বিভেদমূলক কথা আপনি উইথড্র করুন, তা না হলে —

যোগেন্দ্রনাথ : তা না হলে কি করবেন ?  মিঃ হামিদুল চৌধুরী আপনার লাল চক্ষু অন্যকে দেখাবেন । বরিশালের যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল কারো লাল চক্ষুকে ভয় করে না । কারণ লাল চক্ষু আমারও আছে । আরে মিঞা, আমি জনগণের সেবক হিসেবে মন্ত্রীত্ব করি । কারো গোলাম হিসেবে নয় । বাংলার সর্বত্র মন্বন্তর, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মরেছে, তাদের জন্য হক মন্ত্রীসভা কিচ্ছু করেনি । সকল শ্রেণীর ছাত্র -ছাত্রীদের শিক্ষা প্রসারের জন্য কিছু করেনি । এমনকি শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মঙ্গলের জন্যও কিচ্ছু করেনি, তাই আমি শ্যামা – হক মন্ত্রীসভাকে ভেঙেছি  । প্রয়োজন হলে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনাদের এই খাজা নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভাও ভেঙ্গে দিতে পারি । এ কথাটা মনে রাখবেন সবাই ।

সাংবাদিক : আপনার রণংদেহী মুর্তি দেখে ডা: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বললেন – দেখলেন তো, বরিশালের নমোর ব্যাটা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল কেমন বাঘের মতো আস্ফালন করে চলে গেল । আপনারাতো জানেন, ঐ চাড়ালের ব্যাটার জন্যেই আমার মন্ত্রীত্বটা গেল ।

যোগেন্দ্রনাথ : এই ঘটনার পরে রেশনিং ডিপার্টমেন্ট সহ কত বিভাগে কতজনকে যে চাকরিতে ঢুকিয়েছি । তাদের অধিকাংশই আজ আমাকে ভুলে গেছে । এই যে এতো অভাব অনটনের মধ্যে দিনযাপন করছি , অথচ দু একজন বাদে আর কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়ায় না ।

সাংবাদিক : এই সব কারনেই বাবাসাহেব আম্বেদকর আফসোস করে বলেছিলেন – আমার সমাজের শিক্ষিত মানুষেরাই আমাকে প্রতারিত করেছে বেশী –

( একটা ডাব নিয়ে সরলা বৌদির প্রবেশ )

সরলা বৌদি : মহাপ্রান অনেক খুইজা খুইজা আপনার লাইগ্যা একখান ডাব জোগাড় করছি । আপনি খাইয়া লন –

যোগেন্দ্রনাথ : আমি তো বলেছি  এই স্টেশনের সরকারি কলের জলপান না করে আমি অন্য কিছুই খাবোনা । স্টেশনমাস্টার : ( প্রবেশ ) স্যার , এস ডিও সাহেব আর্জেন্ট অর্ডার ইসু করে দিয়েছেন । টিউবওয়েল বসানোর যন্ত্রপাতি সহ তিনটি নতুন টিউবকল এসে গেছে ।

সরলা বৌদি : সাংবাদিক মশাই, আপনি তাইলে ডাবখান খাইয়া ফালান

সাংবাদিক : মাফ করবেন বৌদি । অতোজন অনশনরত জনতার সাথে আমিও না হয় অভুক্ত থাকলাম । আপনিই বরঞ্চ নারিকেলটা খেয়ে নিন

সরলা বৌদি :  জানেন মহাপ্রান , দুই বছর আগে পরপর পাঁচদিন আমাগো উদ্বাস্তু কলোনির কারোরই খাওন জোটে নাই । শ্যাষে সরকারি ডোল আইলে আমরা সব্বাই খিচুড়ি খাইছিলাম । তাছাড়া এখনো তো মাঝে মাঝে দুবেলা ভাত জোটে না আমাগো ।

যোগেন্দ্রনাথ : ওগো বৌদি, অভাব অনটনের কথা আমাকে আর বলবেন না । আমি সহ্য করতে পারছি না । দলিত – বহুজন মানুষের দু:খ দারিদ্র্য অনাহার অশিক্ষা দূর হবে ভেবেই  আমরা হিন্দু মুসলমানরা মিলে ভারত স্বাধীন করার ব্রত গ্ৰহণ করেছিলাম । কিন্তু সেই কাক্ষ্মীত স্বাধীনতা আমরা অর্জন করতে পারিনি । অদূর ভবিষ্যতেও পারবো কি না জানি না । সারাটা জীবন লড়াই করতে করতে এখন আমি ক্লান্ত অবসন্ন । তাই পরপাড়ের ডাকের প্রতিক্ষাই করছি ( কাঁদে )

সরলা বৌদি : মহাপ্রান তুমি কানতাছো ? তোমার এই লৌহদীপ্ত দেহটার মধ্যেও তাহলে কান্না আছে ?

যোগেন্দ্রনাথ :  আছে বৌদি, আছে । একবুক কান্না জমে আছে বুকের এই খানটায় । আর কেনই বা থাকবে না বলো ! আমারও তো একটা সংসার আছে । একমাত্র পুত্র জগদীশ আছে, ওর অসুস্থ মা ছিল । কিন্তু  তাদের সুখ – স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আমি তো কিছুই করতে পারিনি । ওকালতি করে সৎপথে যতটুকু রোজগার করেছি, তার সবটাই দেশের কাজে এবং জাগরণ পত্রিকার পেছনে খরচ করেছি । তখন একবারও মনে পড়েনি, আমার স্ত্রী, আমার পুত্র, ওঁরাও তো এই দেশের, দশেরই একজন । তাই ওদের কথা, দলিত বহুজনেদের কথা মনে করে আমি নিদ্রাহীন রাতে শুধু কাঁদি আর কাঁদি ( কাঁদে )

সরলা বৌদি : ঠাকুরপো, তুমি আর কাইন্দো না ( চোখের জল মুছে দেবে ) দ্যাখো তোমার কান্না দেইখা আমাগো কলোনির সক্কলে কানতাছে । তাছাড়া তুমি কাঁদলে আমাগো কান্না ঘোচাইবো কেডা ?

যোগেন্দ্রনাথ : ঠিক বলেছেন বৌদি । কান্না তো আমার সাজেনা । আমি তো দলিত মুক্তির সংগ্ৰামী সৈনিক । তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় আমার বলা উচিৎ –

” আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত –

আমি সেই দিন হব শান্ত ।

তবে উৎপিড়ীতের ক্রন্দন রোল

আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারির খরগ – কৃপাণ ভীম রণভঊমএ রণিবে না

আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত সেই দিন হব শান্ত ।।

সাংবাদিক : মিঃ মন্ডল, আমি চুপচাপ আপনার অজানা বেদনার কথা শুনলাম । এবার ভালো করে দেখে বলুন তো, আমাকে চিনতে পারেন কিনা ?

যোগেন্দ্রনাথ : দু:খিত । আমি আপনাকে চিনতে পারছিনা

সাংবাদিক : না পারাটাই স্বাভাবিক । একটা সময় আমার মতো কতো সাংবাদিক আপনাকে সদা-সর্বদা ঘিরে থাকতো ।

যোগেন্দ্রনাথ : কেন থাকতো জানেন ? আমি ও ড: আম্বেদকর কবে মুসলিম, শিখ অথবা বৌদ্ধ ধম্ম গ্ৰহণ করবো তাই নিয়ে মুখোরোচক গল্প তৈরি করতে –

সাংবাদিক : ক্ষমা করবেন । আমি সেই দলের সাংবাদিক নই । আপনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্নেহধন্য হলেও, আমিও তাঁর কিঞ্চিত স্নেহের পরশ পেয়ে আপনাদের সঙ্গে ১৯৪০ সালে বরিশালের বাণীপীঠ স্কুল ময়দানের জনসভায় উপস্থিত থাকার অনুমতি পেয়েছিলাম । মনে পড়ছে। ?

যোগেন্দ্রনাথ : হ্যা – হ্যা মনে পড়েছে । গুরুচাঁদ ঠাকুরের মতুয়া দর্শন , কৃষি ও শিক্ষা আন্দোলন সম্পর্কে আপনি একটি অমূল্য বিশেষন দিয়েছিলেন গুরুচাঁদ ঠাকুরকে –

সাংবাদিক : বিশেষণ কি না জানি না। তবে আমি বলেছিলাম – এতোদিন জানতাম পশ্চিমবঙ্গে আরো দু চারজনের মতো ঈশ্বরচন্দ্র সর্মাই বিদ্যাসাগর নামে প্রচারিত । এবার পূর্ববঙ্গে এসে আবিষ্কৃত হলো প্রচারবিহীণ আর এক বিদ্যাসাগরের তিনি হরিচাঁদের পুত্র গুরুচাঁদ বিশ্বাস ঠাকুর ।

যোগেন্দ্রনাথ : এবার কোলকাতা ফেরার আগে আগৈলঝাড়া গ্ৰামে আমার রাজনৈতিক গুরু , নিরক্ষর শিক্ষাব্রতি ভেগাই হালদার মহাশয়ের বাস্তুভিটা এবং স্কুলটি দর্শন করে যাবেন । যিনি ভিক্ষা করে ১৯০৬ সালে প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন । তিনি ফজলুল হক, অশ্বিনী দত্ত এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্নেহধন্য ছিলেন  ।

সাংবাদিক : বলেন কি এমন মহান শিক্ষাবান্ধবের জীবনকথা আজও অনালোচিত, অনালোকিত ! আমি অবশ্যই যাবো দর্শন করতে । সেই সঙ্গে আপনার বসতবাড়িও দেখে আসবো

যোগেন্দ্রনাথ : কে আপনি, কি নাম আপনার ?

সাংবাদিক : আমি তো আগেই বলেছি – আমি সাংবাদিক –

যোগেন্দ্রনাথ : না, আপনি সাধারণ সাধারণ সাংবাদিক নন । আ‌মার মনে হচ্ছে আপনি আমার জাগ্ৰত বিবেক নয়তো অন্য কেউ । তা নাহলে আমার জীবনের এতো কথা আপনি জানলেন কি করে ?

সাংবাদিক : ( মুচকি হেসে ) আমি বিশ্বাস করি আপনার স্মৃতিশক্তির মতো দৃষ্টিশক্তিও এখনো প্রখর আছে । আপনিই বলুন না কেন আমি ?

যোগেন্দ্রনাথ : ( মুখের দিকে তাকিয়ে ) তবে কি, তবে কি ! হা: হা: হা:  –

সাংবাদিক : হাসছেন যে ?

যোগেন্দ্রনাথ : এতক্ষণে চিনতে পেরেছি । আপনি সেই ব্যতিক্রমী সাংবাদিক বন্ধু মিঃ ঘোষ । বুকে আসুন ভাই , বুকে আসুন । ওহ: একযুগ পরে আপনার সঙ্গে দেখা হলো । জানেন মন্ত্রীত্ব চলে যাবার পরে, হিন্দুস্থান – পাকিস্তানের নোংরা রাজনীতির ঘূর্ণিঝড়ের উত্তাল প্রবাহে আমি শুধু ভেসেই চলেছি – ভেসেই চলেছি । যেদিকে তাকাই শুধু হতাশা লাচ্ছনা গঞ্জনা। স্বার্থপরতা আর বিশ্বাসঘাতকতা ।

সাংবাদিক : কে বলেছে আপনি গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে চলেছেন ! আপনি তো আগের মতোই দলিত বহুজনেদের এবং উদ্বাস্তু আন্দোলনের খাঁটি নেতা হয়েই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন । তাইতো নুরপুর, সুপুর উদ্বাস্তু কলোনির ছিন্নমূল মানুষের ডাকে তাদের সমস্যার সমাধান করতে আপনি এই বোলপুরে এসেছেন  । এবং হঠাৎ অবাক জলপান  আন্দোলনের জন্য অনশনে বসেছেন । এটাই তো একজন জনপ্রিয় জননেতার মাপকাঠি ।

স্টেশনমাস্টার : ( এক গ্লাস জল হাতে নিয়ে প্রবেশ ) স্যার – স্যার, আপনার অবাক জলপান আন্দোলনের জয় হয়েছে । এবার এই একগ্লাস জলপান করে অনশন ভঙ্গ করুন স্যার –

(  যোগেনবাবু জল পান করেন  )

সরলা বৌদি : তার মানে এখনো সরকারি বাবুরা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের ভয়ে থর থরাইয়া কাঁপে-

স্টেশনমাস্টার : হ্যা বৌদি, সেই সঙ্গে কুয়োরজল ও পরিশুদ্ধ করা হচ্ছে ।

সাংবাদিক : ( গানের সুরে ) আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।

সরলা বৌদি : অবাক জলপান করাইলো কে ?

নেপথ্যে : ( মঞ্চের তিন জনে ) যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল – আবার কে  । ( দুই তিনবার শ্লোগান )

যোগেন্দ্রনাথ : না না বন্ধুগন, আজকের এই জয় আমার একার নয় ! এ জয় আপনাদের সকলের জয় । কারণ এখানে উপস্থিত আপনারা যদি দলবদ্ধ হয়ে আমাকে সঙ্গ না দিতেন, তাহলে সরকারি অফিসারদের টনক নড়তো না । কাজেই আপনারা যদি মনে করেন ইংরেজরা চলে গেছে বলে আমাদের উপর আর কোনো অন্যায় অত্যাচার অবিচার হবে না, তা হলে ভুল করবেন । মনে রাখবেন, সাদা চামড়ার শাসকের পরিবর্তন হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণযন্ত্রের কোনরুপ পরিবর্তন হয়নি । যেহেতু এই দেশে এখনো শাষন ও শোষন ক্ষমতা রয়ে গেছে সেই বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং মনুবাদীদের হাতে । কাজে কাজেই বন্ধুগন, আপনারা ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ দলিত বহুজনরা যদি নিজস্ব একটি রাজনৈতিক দলের নীল পতাকাতলে একত্রিত হয়ে গণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঐ দিল্লীর শাষন ক্ষমতা দখল করতে না পারেন, তাহলে অপশাসনের জগদ্দল পাথরটাকে কিছুতেই সরাতে পারবেন না । এবং গৌতম বুদ্ধ, ও  ড: আম্বেকরের দর্শনকে বাস্তবায়ন করতে পারবেন না । তাই আমার সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে উচ্চকন্ঠে বলুন – দলিত বহুজনরা দিচ্ছে ডাক – ব্রাহ্মণ্যবাদ নিপাত যাক । জয় ভীম – জয় ভারত।

সরলা বৌদি : বলুন – মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল জিন্দাবাদ – জিন্দাবাদ ।।

নেপথ্যে ও মঞ্চে  : ( সকলেই ) মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল জিন্দাবাদ – জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ

                           ( যবনিকা )

আপনার কেমন লাগলো?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *